Fri. Feb 23rd, 2024

সর্বজন স্বীকৃত “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড ” এই বানীটির মূল প্রতিপাদ্য হলো ” যে জাতি যতটা মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত, সে জাতি ততটা উন্নত “। ব্যক্তি পর্যায়ে নিজেকে উন্নত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পূর্বশর্ত হলো মৌলিক শিক্ষা অর্জন। আসলেই কি আমাদের সন্তানেরা মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, নাকি একাডেমিক নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি রপ্ত করে সনদ স্বাক্ষীর শিক্ষায় নিজেদের শিক্ষিত হিসেবে দাবী করছে। গোল্ডেন জিপিএ প্রাপ্ত আমাদের সন্তানদের বর্তমান আচরণই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে মৌলিক শিক্ষালাভের অভাববোধ। একাডেমিক শিক্ষার সাথে মৌলিক শিক্ষাদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দেশের গুটিকয়েক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর অভাববোধ লক্ষনীয়।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মহান ও মহৎ মানুষের অভাবে শিক্ষা এখন বানিজ্যিক পন্য হিসেবে একাডেমি থেকে স্থান করে নিয়েছে একশত বিশ বর্গফুটের কোচিং সেন্টার নামক কথিত চটকদার শিক্ষা পন্ডিতদের কাছে। কোচিং সেন্টারগুলো মৌলিক শিক্ষাদানে ব্যর্থতার ছাপ রাখলেও রাষ্ট্রের বেশীরভাগ একাডেমিতে যে শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে তা প্রমাণ করতে সফল হয়েছে। কারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত শিক্ষাদানের অভাব রয়েছে বলেই শিক্ষার্থীরা আজ কোচিং নির্ভর হতে বাধ্য হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই দুর্বল ও অপরিপক্ক শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে গত বিশ বছর আগে হয়তো কোচিং সেন্টারের জন্ম হয়েছে।কোচিং সেন্টারের জন্মটা ছিলো শিক্ষার ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে। কিন্তু আদৌ কি তারা শিক্ষার ঘাটতি মেটাতে সক্ষম হয়েছে, নাকি বানিজ্যিক লক্ষ্যের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাসের মহাউৎসবের সাথে অনেকেই জড়িত হয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অসদুপায়ে সন্তানের গোল্ডেন জিপিএ নিশ্চিত পূর্বক আমাদের মতো অভিভাবকদের সামাজিক মর্যাদা বা সোস্যাল ডিগনিটি উপহার দিচ্ছে। অর্থাৎ সন্তানের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের চেয়ে অভিভাবক হিসেবে আমরা সোস্যাল স্ট্যান্ডার্ডকে বেশী প্রায়োরিটি দিচ্ছি। তাহলে মৌলিক শিক্ষা কোথায় গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে? না একাডেমিতে, না কোচিং সেন্টারে!

অবাক বা হতভম্ভ হওয়ার কিছু নেই। কোচিং সেন্টারের বানিজ্যিক গল্প এখানেই শেষ নয়। কোচিং সেন্টারের ব্যপারে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় নানা সময়ে অনেক ভয়ংকর তথ্যের প্রকাশ ঘটেছে, যা অভিভাবকদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে। বানিজ্যিক চিন্তাচেতনার পাশাপাশি কোচিং সেন্টারের আড়ালে রাজনৈতিক অশুভ চর্চার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করে শান্তিপূর্ণ দেশকে কি ভাবে অস্থিতিশীল করতে হয়, নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে কি ভাবে রাজনৈতিক ফায়দা ও টার্গেট স্ট্যাবলিস করা যায়, ধর্ম ও গোত্রভিত্তিক এমন চর্চায় নাকি অনেক সংখ্যক কোচিং সেন্টাররের মুখ্য মিশন হিসেবে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের কিভাবে ডগমেটিক বা মতান্ধ বানাতে হয়, রিলিজিয়াস ফান্ডামেন্টালিস্ট হয়ে কিভাবে ধর্মের পবিত্রতা সমুন্নত রাখতে হয়, শান্তিপূর্ণ দেশে সেকুলারিজম শব্দের সহাবস্থান রুইন করার শিক্ষাও নাকি দেওয়া হয়। তাহলে আমাদের সন্তানেরা কি কোচিং সেন্টারের এমন রসালো রিলিজিয়াস বানীতে নিজের জীবনের হিসেব কষছে। হয়তোবা। না হলে বিভিন্ন বেসরকারি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কিভাবে নিজ জীবন বিসর্জন দিয়ে অন্যদের হত্যা করেছিলো, কিছু ধরাও পড়েছিলো। দেশের বিভিন্ন জঙ্গী অপারেশন তার অনেক সাক্ষ্য বহন করে। এখানে কিছুকিছু কোচিং সেন্টারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ!

শিক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক বানিজ্যিক কোচিং সেন্টার পরিচালনার ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের স্লাক সুপারভাইজিং এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে অবৈধভাবে পরিচালিত কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে তেমন দেখা যায়না। মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কিছু কোচিং সেন্টারের তালা ঝুললেও বাকীরা বহাল তবিয়তে মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান কোচিং সেন্টার গুলোর মালিকানার সাথে নামি-দামি অনেক সরকারী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। হয়তো একারণেই নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কোচিং সেন্টারগুলো খুব দাপটের সাথে আইনবহির্ভূত বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে এমন বানিজ্য আর অসদুপায় অবলম্বন আমাদের কারোরই কাম্য নয়। কারণ, মেধাবী জাতি গঠনে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষাদান রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব নিশ্চিতকল্পে যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন, তাদের আরও আন্তরিক ও সাহসী ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। শিক্ষাকে বানিজ্যে রূপায়ণ না করতে শিক্ষা সেক্টরে দায়িত্বশীল যে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের কর্তব্যকাজে গাফিলতি ও অসদুপায় অবলম্বনের প্রমাণ পাওয়া গেলে এদের বিরুদ্ধে তড়িৎ আইনী ব্যবস্থা নিতেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দৃশ্যমাণ ভূমিকা রাখতে বদ্ধপরিকর হতে হবে।

জেলা পর্যায়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি মাননীয় জেলা প্রশাসকেরাই আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এডিসি (শিক্ষা) সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন। এত কিছুর পরেও যদি শিক্ষা ব্যবস্থা বানিজ্যিক ও পন্যসুলভ হয়, তাহলে আগামীর সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ বিনির্মানে স্পর্শকাতর ও নীতি নির্ধারণী পদগুলিতে পদায়নের ক্ষেত্রে মেধাবীদের উল্লেখযোগ্য অভাব পরিলক্ষিত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ভিশন বাস্তবায়নে শিক্ষাকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড করতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সেক্টরে দায়িত্বরত সকলের সমন্বিত প্রয়াস দরকার। উন্নয়নের পূর্বশর্ত মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত কল্পে শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদানের ব্যবস্থা অত্যাবশকীয় করলে ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, যেমনটা দেখেছি কোচিং সেন্টারের জন্মের পূর্বে। শিক্ষকের আন্তরিক ও কৌশলী পাঠদানে সেকালে মেধাবীদের জন্মহতো একাডেমিক শাসন ও জবাবদিহিতা নির্ভরে, আর এখন কথিত মেধাবীদের আত্নপ্রকাশ ঘটে কোচিং নির্ভর প্রশ্নপত্র ফাসের উপর ভর করে। যদিও মেধাবীদের আত্নপ্রকাশ ঘটছে তবে মৌলিকতা নির্ভর নয়।

সচেতন অভিভাবক, নাগরিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে শিক্ষাকে বানিজ্যিক ও পন্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করতে একাডেমিক শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিতকল্পে সোচ্চার হই। কোচিং সেন্টার নির্ভরতা বাদ দিয়ে শিক্ষাকেন্দ্রে ও গৃহে সন্তানের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হই। গ্লোবাল চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে স্থান করে দিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আপসহীন মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাই। সুশিক্ষিত সন্তানই সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ বিনির্মানে অগ্রনায়ক হয়ে আমাদের মাথা উচু করে দাড়াতে মূখ্য ভূমিকা রাখবে ।

মোস্তাফিজুর রহমান।

গোপালগঞ্জ।

তারিখঃ ২৫/০৫/২০১৯ ইং।

Leave a Reply

Your email address will not be published.