Fri. Feb 23rd, 2024

(হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যান্য সম্প্রদায়ের ন্যায় শ্রদ্ধা ও ভালবাসা রেখে আমার এই বিশ্লেষণ)

—- মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলা অভিধানে বলা হয়েছে হিজড়া শব্দটির আগমন হয়েছে হিন্দি থেকে । সংস্কৃত ভাষায় নপুংসক শব্দটি পাওয়া যায় ।কারোকারো মতে হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবী হিজরত বা হিজরী শব্দ থেকে যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা Migrate বা Transfer । ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা দৈহিক বা জেনিটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না । ভ্রুনের বিকাশকালে নিষিক্তকরন ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই । এর ফলে বিভিন্ন গঠনের হিজড়া শিশুর জন্ম হয়

আমাদের মানবিক অবক্ষয়ের কারনে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দিক থেকে হিজড়া সম্প্রদায় নানাভাবে অবহেলিত। ট্রান্সজেন্ডারের কারনে স্বীকৃতি শব্দটা যেন তাদের সামাজিক পরিচিতির জন্য ব্লক। কোন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় জন্মের পর থেকে তারা নিজ বলয়ে বেড়ে উঠে তাদের গঠিত কানুনকে অনুসরণ করে বিধায় সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত বিধি বিধান গুলোর তোয়াক্কা না করেই জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে তারা অশালীন ও অনভিপ্রেত আচরণ করে থাকে।
পারিবারিক তদারকি,সামাজিক বন্ধন, একাডেমিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাবে তারা বাচার তাগিদে জুলুমের সংস্কৃতি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।

মানুষ হিসেবে,সামাজিক জীব হিসেবে,দেশের নাগরিক হিসেবে, পরিবার ও রাষ্ট্রের নিকট এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের মৌলিক অনেক কিছু আমাদের মতোই প্রাপ্য রয়েছে । অথচ আগে থেকেই তাদের প্রতি সকলের বিরুপ ধারনা থাকায় শিক্ষালয়,চিকিৎসালয় ও রাষ্ট্র পরিচালিত সেবামূলক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট বা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে হোমোজিক্যাল ম্যানারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে যা সকলের জন্য রীতিমতো অসহনীয় পেইন।

সৃষ্টির জন্য স্রষ্টা, আর কর্মের জন্য স্বীয় আচরন দায়ীর সংস্কৃতিতে মানুষ হিসেবে আমি যে অপার সুবিধা পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে পাচ্ছি, তার কোন অংশে তারা যদি ডিসক্রিমিনেশনের শিকার হয় তাহলে তাদের মানুষ বলার সার্থকতা কোথায়? গৃহপালিত সকল প্রানীর যে নিদিষ্ট সুবিধা পরিবার ও রাষ্ট্র সারাক্ষণ নিশ্চিত করে যাচ্ছে, সে তুলনায় এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো অনেক বেশী প্রাপ্য হলেও, মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ঘোষণা থাকার পরেও আমাদের মানবিক মূল্যায়নের মানদণ্ডটা যেন তাদের প্রতি পশুর চেয়ে অধম হিসেবে পারফর্ম করার প্রাকটিস সেই থেকেই লক্ষ্য করে যাচ্ছি।

“প্রয়োজন আইন মানে না” যদি আমার কর্মকান্ডের জন্য স্বীকৃত হতে পারে, তাহলে সুবিধা বঞ্চিত এই হিজড়া নামক মানুষ গুলো দুমুঠো ভাতের জন্য, বেচে থাকার চ্যালেঞ্জে লজ্জাশরম জলাঞ্জলি দিয়ে পকেট থেকে দশটাকা কেড়ে নিলে মৌলিকতার প্রশ্নে প্রচলিত আইনের ” ব্যত্যয় ” শব্দটি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়ারই কথা।

অবহেলিত এই মানুষ গুলোর আচরণ ও বেআইনি কর্মকান্ড নিয়ে মাঝমাঝেই পত্রপত্রিকায় অনেক কিছু ছাপা হয়। পরিবার যদি নিজ আলয়ে, শিক্ষক যদি শিক্ষালয়ে,ডাক্তার যদি চিকিৎসালয়ে,চাকুরীর স্থলে তাদের অধিকার সকলের মত নিশ্চিত করে তাহলে পত্রিকার পাতার খবরগুলো হয়তো অন্যভাবে আসতে পারতো। মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের সংবিধানের কোন ধারায় উল্লেখ আছে যে মানুষ হিসেবে হিজড়াখ্যাত সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয় কোন সুবিধার অন্তর্ভূত নয়।যদি এমন ঘোষণা না থাকে তাহলে প্রজাতন্ত্রের অধিকার নিশ্চিত প্রকল্পের বিভিন্ন ইন্সটিটিউশনে যারা এই সম্প্রদায়কে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছেন তার জন্য তাদের নোংরা মানষিকতাকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিৎ।

হিজড়া সম্প্রদায়ের ঐক্যের সংগঠন ” বাধন ” এ যারা নেত্রী স্থানীয় পর্যায় রয়েছে, তারা সার্বিক অধিকার নিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও, নিজের ভাগ্য উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে রাজধানীতে একাধিক বাড়িগাড়ীর মালিক বনে গিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে যা আমরা পত্রিকার পাতায় এবং বিভিন্ন জরীপে দেখে আসছি। সম্পদ বৃদ্ধির জন্যে সুস্থ মানুষকে অমানবিক ভাবে হিজড়া বানিয়ে দিয়ে তার উপার্জিত অর্থদিয়ে অনেককে অঢেল অর্থের মালিক বনে যাওয়ার খবরও ছাপা হতে দেখেছি। মানবিক গুণাবলী জলাঞ্জলি দিয়ে একজন সুস্থসবল মানুষকে Migrate করে দৈহিকভাবে হিজড়া বানানোর ভয়ংকর সংস্কৃতির ধারকদের অর্থ কামানোর খবর দেখেছি কিন্তু বিচারের মুখোমুখি হতে দেখিনি। সাধারণরা বঞ্চিত করছে মৌলিক অধিকার থেকে,আর হিজড়া সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়রা সাধারণ হিজড়াদের ঠকাচ্ছে অধিকারের শ্লোগানে বিশ্বাস ভঙ্গ করে।

হিজড়াদের জন্য সরকারী দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানের চিত্র না দেখতে পেলেও হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন কল্পে ও পরিবর্তনের প্রত্যয় নিয়ে সম্প্রতি মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের জনপ্রিয় ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব ডি আই জি জনাব হাবিবুর রহমান। তিনি হিজড়াদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে কয়েকটি লেডিস বিউটি পার্লার স্থাপন করে দিয়েছেন, যাতে বিতর্কিত পেশা থেকে স্বীকৃত কর্মে আত্ননিয়োগ করে শতবছরের লালিত অবহেলার সংস্কৃতি থেকে হিজড়া সম্প্রদায় নিজেদেরকে সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে আর বঞ্চনার শিকার হতে না হয়। যতদূর জানি উল্লেখিত পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা জেলা পুলিশসুপার থাকা অবস্থায় সাভারের বেদে পল্লীর মানুষগুলোকে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত করেছেন, তিনি প্রমান করতে সক্ষম হয়েছেন সম্প্রদায় কোন বাধা নয়, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সব সম্প্রদায়ের জনবলই জনশক্তিতে রুপান্তর হয়ে বদলে ফেলতে পারে নিজ জীবনমান, অবদান রাখতে পারে রাষ্ট্রের উন্নয়নে নিজেদের সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে। দোষ আমাদের নয়,অন্যায় হিজড়াদের নয়,দোষ আমাদের নোংরা মানষিকতার।

মানষিকতা বদলে ফেলুন, হিজড়াকে হিজড়া নয়,মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করুন, পাল্টে যাবে ওরা, পাল্টে যাবে দেশ, শ্লোগানে মুখরিত হবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ।

গোপালগঞ্জ।
তারিখ : ২৭/০৫/২০১৯ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published.